
শামসুজ্জামান ডলার, মতলব উত্তর :
১৭ চৈত্র মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) থেকে শুরু চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বেলতলী এলাকার বদরপুরে ঐতিহ্যবাহী ১০৭তম সোলেমান লেংটার মেলা। ৭ দিনব্যাপী এ মেলার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন । তবে বরাবরের মতো এবারও ভক্তদের আগাম উপস্থিতির কারণে মেলার নির্ধারিত তারিখের একদিন আগেই ৩০ মার্চ সোমবার থেকেই শুরু হয়ে গেছে বদরপুরের লেংটার মেলা। যদিও চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক এই মেলার অনুমোদন এখনো দেননি এবং উপজেলা প্রশাসন মেলা উপলক্ষে এখনো আইন-শৃঙ্খলা সভাও করেননি।
অবশ্য, অন্যান্য বছরের হিসেব অনুযায়ী ৭ দিনের এই মেলায় ১৫ লক্ষাধিক লোকের সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানা যায়। তবে বিগত বছরগুলিতে এই মেলায় অন্তত ২ সহস্রাধিক গাঁজার দোকান বসেছে এবং এবারও ঝুঁপড়ির মতো বানিয়ে ব্যাপক হারে গাঁজার দোকান বসতে শুরু করেছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল মারাত্মকভাবে উদ্বিগ্ন হলেও এ বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়না বলেও অভিযোগ করলেন এলাকার মাঝ বয়সী কয়েকজন। তবে মেলা কর্তৃপক্ষের প্রধান লাল মিয়ার দাবি, লেঙটা বাবার ভক্ত পাগলরা মাদক সেবনের জন্য যেই আস্তানা বা দোকানগুলো বসান সেগুলি মাদক বিক্রির দোকান হিসেবে চিহ্নিত হবে না।
কোন ধরনের ইজারা না থাকা সত্ত্বেও বিগত সময়ে মেলার ৭দিনে নদীপথে প্রতিদিনে শতশত ট্রলার ও লঞ্চগুলো নদীর তীরবর্তী ১ থেকে দেড় কিলোমিটার অঞ্চলে যাত্রী নামানোর যাত্রী ও ঐসব নৌযান থেকে নদীরপাড়ে বাঁশের ঘেড়দিয়ে অবৈধভাবে বিগত সময় চলেছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। সড়কপথে আসা বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকেও প্রকাশ্যেই চলেছে ব্যাপক চাঁদাবাজি এবং হরের রকমের জুয়ার উৎসব। এবারেও তার পূনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় লোকজন ।
তবে, এই মেলার আগমুহূর্তে আইন শৃঙ্খলা সভায় এখানে মাদকের দোকান বসানো, মাদক কেনাবেচা ও সেবন, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন রকমের জুয়া, অশ্লীল নৃত্য, চুরি-ছিনতাই, পকেটমারি সহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও বিগত সময়ে তা মোটেও মানা না হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয় মতলববাসীর মাঝে। অনুমোদন না পাওয়ায় যদিও এখন পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের সাথে মেলা বা ওরশ কর্তৃপক্ষের আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে কোন সভাই হয়নি।
তবুও ইতোমধ্যেই মাজার এলাকায় ভক্তদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। তবে এই মেলাকে কেন্দ্র করে মাদকের মেলা বা মাদকের জমজমাট হাট এবং নানা রকমের জুয়ার আসর বসার বিষয়টি নিয়ে রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা।
রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরের পর লেংটার মেলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বেলতলী লঞ্চঘাট থেকে সাদুল্ল্যাপুর মোড় পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এলাকার চারপাশ জুড়ে মেলার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন । দোকানপাট সংস্কার, অস্থায়ী স্টল নির্মাণ ও ভক্তদের আস্তানা গড়ে তোলার কাজও শেষের পথে । সোলেমান লেংটার মাজারের আশপাশে তাঁর ভক্তদের অন্তত ১৮ থেকে ২০ টি মাজারগুলোতেও চলেছে ধোয়া মুছার কাজ। লেংটার মাজারের কাছাকাছি ও আশপাশের অঞ্চলে অন্তত ২ শতাধিক খানকাও রয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন পেশার মানুষদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই খানকাগুলোর বেশীরভাগ খানকাতেই বিগত সময়ে গানের তালে তালে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের অশ্লীল নৃত্যের ঘটনা ঘটেছে। তারা আরও জানায়, শুধু এই খানকাগুলোতেই নয় আশপাশ অঞ্চলে কোন ধরনের বাধা ছাড়াই ব্যাপক হারে অশ্লীল নৃত্য ও নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলে আসছে এখানে।
সরেজমিনে আরো দেখা গেছে, মাজারের পিছনের বা পশ্চিমপাশে অন্তত ১০/১২টি পুকুরের পাড়গুলো ও ইট সোলিং রাস্তার পাশে (গোরস্থান সংলগ্ন) মোল্লাকান্দির বিভিন্ন গাছের বাগানগুলোতে ঝুঁপড়ির মতো আস্তানা গেড়ে বসতে শুরু করেছে গাঁজার দোকানগুলো। ইতিমধ্যেই ওখানে কিছু ক্রেতা-সেবনকারীর উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। গাঁজা দোকানী হিসেবে পুরুষদের পাশাপাশি নারী বিক্রেতাদেরকেও দেখা গেছে। এই মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেশাগ্রস্তদের সমাগম ঘটে। এই মেলা সারা দেশের মাদকসেবীদের একটা মিলনমেলায় পরিনত হয় বলেও স্থানীয়দের কাছে জানা গেছে । তবে স্থানীয়রা এই মেলার বিরুদ্ধে ভয়ে ভয়ে কিছু কথা বললেও তাদের নাম প্রকাশ না করার জন্য সর্বোচ্চ অনুরোধ জানান ।
সোলেমান নেংটা মেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা যায়, পীর ও সাধক হযরত শাহ সুফি সোলায়মান (রহ.) ওরফে লেংটা বাবা বাংলা ১৩২৫ সালের চৈত্র মাসে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকেই প্রতি বছর তার মাজারকে কেন্দ্র করে চৈত্রের ১৭ তারিখে ওরশ ও মেলার আয়োজন করা হয়। ‘লেংটার মেলা’ নামে পরিচিত এ আয়োজনে প্রতিবছর প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লক্ষাধিক লোক সমাগম ঘটে। ১৭ চৈত্র, ৩১ মার্চ, মঙ্গলবার থেকে বেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভক্তদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে একদিন আগ থেকেই মেলার কার্যক্রম শুরু হয়ে যায় বলেও তারা জানান।
তবে প্রতি বছরের মতো এবারও মেলাকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই মেলা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে হওয়ায় নৌপথে মেঘনা ও ধনাগোদা নদী দিয়ে লাল রঙের পতাকা সহ নানা রঙের সাজসজ্জা করে ৭দিনের প্রতিদিনই শত শত ট্রলার ও লঞ্চ মেলা এলাকায় আসে। মেলার এই ৭ দিন পুরো নদী এলাকায় যেন একটি অন্যরকম সাজে সজ্জিত থাকে। স্থানীয়দের মাঝে এক অন্যরকম আমেজ দেখা যায়। তবে, যার মৃত্যু দিবসকে ঘিরে মতলবের বদরপুরে ৭ দিনে ১৫ লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে সেই শাহ সোলেমান লেংটা কিন্তু তার জীবদ্দশায় একজন ভক্তও তৈরি করে যাননি বলে জানাগেছে স্থানীয় বেশ ক’জন বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে কথাবলে।
মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদ মসজিদের খতিব মাওলানা এনামুল হক এর সাথে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি জানান, ইসলামে মাদক, নারী-পুরুষের বেহালাপনা-অশ্লীলতা ইসলাম ধর্ম সমর্থন করে না। ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে ইসলাম পরিপন্থী কার্যক্রম পরিহার করা উচিত।
সোলেমান শাহ (রহ.) এর মাজারের খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়া’র সাথে মেলায় ব্যাপক গাঁজার দোকান কেন বসে এর উত্তরে তিনি বলেন, যেসব এলাকায় এগুলো বসে ওই জায়গাগুলো আমার নিয়ন্ত্রণাধীন না। তাই আমি এগুলো বন্ধ করতে পারছিনা। তবে ল্যাংটার ভক্তদের মাদক সেবনের আস্তানা গুলোকে গাঁজার দোকান বলা যায় না।
নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে রিজার্ভ ট্রলার-লঞ্চের যাত্রীদের তীরে নামার পর ব্যাপক চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, যারা লঞ্চঘাট ইজারা আনে এইটা তাদের বিষয়ে এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে, আমরাও চাই এই লেংটার মেলা বা ওরশকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈতিক কাজ না হোক। এ বিষয়ে আমি সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।
মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, মেলার আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পোশাকধকরী অর্ধশত পুলিশ সদস্য এবং সিভিল পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যই এখানে কাজ করবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, মতলবের সোলেমান লেংটার মেলা অনেক বড় এবং বিশাল আকৃতির মেলা। জেলা প্রশাসন থেকে এখনো এই মেলার অনুমোদন দেয়া হয়নি। অনুমোদন পেলে এই মেলার শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের সাথে আইনশৃঙ্খলা সভা হবে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে ভূমিকা রাখা হবে।
মন্তব্য করুন