শাহরাস্তি , তৃতীয় পাতা

শাহরাস্তির আইরিন কুমারীত্বের পরীক্ষা দিয়েও রক্ষা পেলো না জীবন

person access_time 2 weeks ago access_time Total : 34 Views

মোঃ মাসুদ রানা, শাহরাস্তি ঃ শাহরাস্তিতে আইরিন সুলতানা (২৩) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। ওই মৃত্যু নিয়ে তার পরিবার ও স্বজনদের মাঝে তৈরি হয় উৎকন্ঠা ও ধুম্রজাল। ওই রহস্য উন্মোচনে বেরিয়ে আসতে শুরু করে গৃহবধূ আইরিনের সংসার জীবনের নানান অজানা তথ্য। শাহরাস্তি উপজেলা মেহের উত্তর ইউপির বরুলিয়া গ্রামের পুরাতন বাড়িতে চাঞ্চল্যকর মৃত্যুর এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ এরই মধ্যে অভিযুক্ত শাশুড়ি পেয়ারা বেগমকে (৪৮) আটক করে চাঁদপুর জেল হাজতে প্রেরণ করে। নিহত গৃহবধূর পরিবার ও স্থানীয় সুত্র জানায়, ২০১৫ সালের (৩১শে জানুয়ারি) শাহরাস্তির টামটা উত্তর ইউপির মুড়াগাঁও গ্রামের বড় বাড়ির শাহজাহান মিয়ার(৫৮) ছোট মেয়ে আইরিন সুলতানার সঙ্গে একই উপজেলার মেহের উত্তর ইউপির বরুলিয়া পুরাতন বাড়ির সিদ্দিকুর রহমানের(৫৫) পুত্র মোঃ আরিফুর রহমানের (৩০)সাথে পারিবারিক সম্মতিতে দেড় লক্ষ টাকা দেনমোহরে বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয়।ওই সময়ে বিবাহ শেষে নববধূ আইরিনকে বরপক্ষ তুলে নেন স্বামীর বাড়িতে। ওই দিন গড়িয়ে ফুলশয্যার রাতে আরিফ স্ত্রীকে কাছে টেনে ভালোবাসার পরিবর্তে হঠাৎ করে তার চরিত্র এবং কুমারীত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই রাতে তুমুল বিতর্ক শেষে স্বামী-স্ত্রীর মিলন কার্য সম্পন্ন হয়। তখন আইরিনের বয়স কম থাকায় সে শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে কষ্ট প্রকাশ করলে তার স্বামী আরিফ আরো বিরক্ত হয়ে ওঠে। ওই রাতের কষ্টের কথা সকালে মাকে আইরিন শেয়ার করে। সঙ্গে এও বলে মা ওরা আমাকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে সতীত্ব পরীক্ষা করতে চায়।তখন সে মোতাবেক পরদিন তাও করে ফেলে। কিছুদিন যেতেই আরিফ সম্পর্কে স্থানীয়দের মাঝে নানা কথা চাউর হতে থাকে। এর মধ্যেই আইরিনের পরিবার কে যৌতুকের ষোল আনা পূরণ করতে হয়। তাতেও শান্তি না মিলে নির্যাতনের তীব্রতা দিনে দিনে বাড়তে থাকে , এরই মধ্যে সে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এরপর কিছুদিন যেতেই আরিফ জীবিকার প্রয়োজনে পাড়ি জমান দুবাইতে। পরে স্বামীর নিষেধে আইরিনের বাপের বাড়ি আসা একেবারে বন্ধ করে দেয়। শুরু হয় টেলিফোনে অভিনব কায়দায় গালমন্দ নির্যাতন। একাজে স্থানীয় দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন শ্বাশুরি পেয়ারা বেগম(৪৮)। একপর্যায়ে নির্যাতন ও অবিশ্বাসের কষ্ট মাথায় নিয়ে আইরিন একটি (২০১৬ সালে) কন্যা সন্তান জন্ম দেয়। গত ৩০শে আগষ্ট তার মায়ের মৃত্যুর পর ৩ বছর ৭ মাসের মেয়ে আরিয়া সুলতানা লামিয়া এখনো জানেনা তার মা নেই! আর কখনো আসবে না? এমন কষ্ট মাথায় নিয়ে স্তব্ধ কন্ঠে বাকরুদ্ধ আইরিনের মা আফরোজা ইয়াসমিন (৪৫) মেয়ের অল্প দিনের সংসার জীবনের কষ্টের কথাগুলো লিখে রাখা এক টুকরো কাগজ থেকে ৫সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার পড়ে শোনালেন গনমাধ্যামকে। পুলিশ ও নিহত আইরিনের পরিবার জানায়, গত বুধবার (২৭আগষ্ট) দিবাগত রাত ২ টায় শাহরাস্তি উপজেলা মেহের উত্তর ইউপির বরুলিয়া গ্রামে পুরাতন বাড়িতে গৃহবধূ আইরিন রাতে বিষপাণ করে। পরে তার বিদেশ ফেরত স্বামী আরিফ ও তার স্বজনরা তাকে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় কো-অপারেটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করে। নিহতের পিতা মো: শাহজাহান মিয়া বলেন, আমার অসুস্থ মেয়েকে এলাকায় চিকিৎসার জন্য না রেখে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করালে আমাদের সন্দেহ হয়। পরে আমি শাহরাস্তি থানার নিকট ঘটনা খুলে বললে (ওসি) শাহ আলমের নিকট আইনি সহায়তা চাই। তাতে ওসি (তিনি) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালে তারা আমার মেয়েকে দেখার ব্যবস্থা করে দেন। শুক্রবার (৩০শে আগস্ট) সকালে ডাক্তার আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করে। ওই সংবাদ পেয়ে তার স্বামী আরিফুল ইসলাম, শ্বাশুড়ি ও দেবর আজাদ মরদেহ রেখে একমাত্র মেয়ে লামিয়াকে নিয়ে পালিয়ে যায়। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ নারায়ণগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে আইরিনের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করে। ওই সুরতহাল রিপোর্টে তার শরীরে বাম স্তনের নিচে আঘাতের দাগ রয়েছে বলে উল্লেখ করে। ওই দিনেই স্বজনরা মরদেহ বুঝে নিয়ে বাদ মাগরিব তার বাপের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন করে। শনিবার (৩১ সেপ্টেম্বর) গৃহবধূর পিতা মো: শাহজাহান মিয়া (৫৮) বাদী হয়ে অভিযুক্ত জামাই মোঃ আরিফুর রহমান (৩০) ও তার পরিবারের ৪ জনের বিরুদ্ধে শাহরাস্তি থানা একটি মামলা দায়ের করে। পুলিশ ওই দিনেই অভিযুক্ত শাশুড়ি পেয়ারা বেগমকে (৪৮) আটক করে চাঁদপুর জেল হাজতে প্রেরণ করে। পুলিশ শিশু লামিয়াকে দাদি থেকে উদ্ধার করে নানার বাড়ির স্বজনদের জিম্মায় দেয়। প্রসঙ্গত ,স্বামী আরিফুল ইসলাম ঈদুল আযহার পরদিন দুবাই থেকে বাড়িতে আসে। বরুলিয়া গ্রামের ইউপি সদস্য ভূষণ চন্দ্র দাস বলেন, গৃহবধূর শরীরে বিভিন্ন আঘাতের কথা আমিও শুনেছি। এ ছাড়া বিয়ের প্রথম রাত থেকে মেয়েটির সাথে তার স্বামীর বিবাদের কথা এলাকায় প্রচার রয়েছে। শাহরাস্তি থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, আইরিন সুলতানার মৃত্যুতে প্ররোচনার অভিযোগ পেয়েছি। সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

content_copyCategorized under