সম্পাদকীয়

মর্হরমের শিক্ষা…

person access_time 12 months ago access_time Total : 286 Views

আজ পবিত্র আশুরা। ইসলামী বর্ষ পরিক্রমার প্রথম মাস মর্হরমের ১০ তারিখকে প্রিয় নবী (সা.) আশুরা নামে অভিহিত করেছেন। বিশ্ব ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই দিনে সংঘটিত হয়েছে। সেগুলো যুগে যুগে মুসলমানদের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মুসলমানরা বিশ্বাস করে, আল¬াহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন মহররমের ১০ তারিখে। এ দিনেই তিনি তা ধ্বংস করবেন। এ দিনেই হজরত আদমের (আ.) সৃষ্টি, জান্নাতে প্রবেশ, পৃথিবীতে প্রেরণ ও আল¬তাহতায়ালার দরবারে তার তওবা কবুল হয়। এ পবিত্র দিনে হজরত ইদ্রিস (আ.) বেহেশতে গমন করেন, হজরত নূহের (আ.) তরী প্রবল তুফান ও প্রলয় থেকে রক্ষা পেয়ে তীরে ভিড়ে, দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে হজরত আইয়ুব (আ.) মুক্তিলাভ করেন। এ দিনে হজরত ইব্রাহিমের (আ.) জন্ম, নমরুদের অগ্নিকুন্ড থেকে মুক্তিলাভ, মহান আল¬াহর সঙ্গে তুর পাহাড়ে হজরত মূসার (আ.) কথোপকথন, তাওরাত লাভ, সঙ্গী-সাথীসহ নীল দরিয়া পার এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীর নীল দরিয়ায় সলিল সমাধির ঘটনা ঘটে। হজরত ইউনূসের (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি, হজরত ঈসার (আ.) জন্ম ও সশরীরে ঊর্ধ্বগমন ইত্যাদি বহু ধর্মীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল আশুরাতেই। তবে হিজরি ৬১ সালের এ দিনে ফোরাত নদীর তীরে ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে যে হƒদয়বিদারক ঘটনা ঘটে, তা গোটা মুসলিম জাহানকে শোকে-বেদনায় স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মহররম মাস এলেই কারবালার সেই বেদনামথিত স্মৃতিতে প্রতিটি মুসলমানের হƒদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। কারবালা প্রান্তরে নৃশংস ঘটনা যখন ঘটে, তখন মুসলিম জাহানে চরম অরাজকতা চলছিল। ইসলামের চার খলিফার স্বর্ণযুগ তখন অতীত। মুয়াবিয়াপুত্র ইয়াজিদ তখন রাজতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর। প্রিয় নবীর (সা.) দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এ অন্যায় মেনে নিতে পারেননি। ন্যায় ও সত্যের পতাকা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে সুদৃঢ় শপথ নিতে তিনি ইয়াজিদের বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সে যুদ্ধ ছিল অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার। ইয়াজিদ যুদ্ধের সব রীতিনীতি ভেঙে হত্যা উৎসবে মেতে ওঠে। কারবালা প্রান্তরে পরিবার-পরিজন ও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নির্মমভাবে শহীদ হন রাসূল দৌহিত্র। সত্যের পথে অসীম সাহসী বীর হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তার স্বজন ও সহযোদ্ধারা মৃত্যু অবধারিত জেনেও আপসহীন যুদ্ধ করে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। ইয়াজিদ বাহিনী ফোরাতের তীর অবরুদ্ধ করে দিনের পর দিন একবিন্দু পানিও পান করতে না দিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার সহযোদ্ধাদের নিদারুণ কষ্ট দিয়েছে। পিপাসায় কাতর হয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু ইসলামের মহান শিক্ষা ও ঈমানের পথ থেকে তারা মুহূর্তের জন্য বিচ্যুত হননি। আশুরার এ দিনটি মূলত মুসলমানদের কাছে কারবালার সে দুঃসহ স্মৃতিই বহন করে আনে। এ শোককে আস্তস্থ করে ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগির নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মাতমের নামে বিশৃংখলা সৃষ্টি কিংবা উৎসবমুখর মিছিল কারবালার সেই আত্মত্যাগ ও আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ন্যায় প্রতিষ্ঠার কঠিন সংগ্রামে অসীম সাহসের সঙ্গে আপসহীন লড়াই করে কিভাবে প্রয়োজনে আত্মবিসর্জন দিতে হয়, সে শিক্ষা আমরা লাভ করতে পারি কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা থেকে। আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষ লোভ ও হিংসার আগুনে জ্বলছে। মানবতা বিপন্ন। মুষ্টিমেয় মানুষের লোভের কাছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শান্তিতে বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। এ সময় কারবালার মহান আদর্শে আমরা উজ্জীবিত হতে পারি। ন্যায়ের প্রতি অবিচল নিষ্ঠাই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে সব অন্যায় ও অশান্তি থেকে। পবিত্র আশুরায় তাই প্রার্থনা- সত্যের উজ্জ্বল আলোয় দূর হোক মিথ্যার কালিমা। জয় হোক ন্যায় ও সত্যের।

content_copyCategorized under