প্রথম পাতা , শীর্ষ খবর , ফরিদগঞ্জ , ব্রেকিং নিউজ

ফরিদগঞ্জে ২০১৮ সালে ৪৩টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে

person access_time 3 months ago access_time Total : 79 Views

নূরুল ইসলাম ফরহাদ ঃ সারাদেশের মতো ফরিদগঞ্জ উপজেলায়ও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যুর ঘটনা। গড়ে প্রতি মাসে কোথাও না কোথাও অপমৃত্যুর শিকার হচ্ছে নারী-শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ। সড়কেও রক্ত ঝরছে মানুষের। পানিতে ডুবে মরার মিছিলও দীর্ঘ হচ্ছে, শ^াসরোধ করে হত্যার মতোও ঘটনা ঘটছে। জনম দুঃখীনি মাকে হত্যার মতো জগন্য ঘটনাও ঘটেছে এখানে। এ ছাড়াও বিষপান করে, ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ায় ঠেকানো যাচ্ছে না অপমৃত্যুর মিছিল। অপমৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ নারী-পুরুষ ও শিশু আত্মহত্যা করছে। বয়স্ক নারী-পুরুষের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীরাও আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছেন।
ফরিদগঞ্জ থানার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারী থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ গত ১ বছরে ৪৩টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২২ জন গলায় ফাঁস দিয়ে, ২ জন বিষপানে বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। আত্মহত্যার যে কটি ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশই নারী। পরীক্ষায় অকৃতকার্য, প্রেম, পরকীয়াসহ দাম্পত্যকলহের জের ধরে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের রেকর্ডের বাহিরেও একাধিক মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। এ ছাড়াও গাছ থেকে পড়ে, বিদ্যুৎস্পর্শ হয়ে, সড়ক দুর্ঘটনায়, পানিতে ডুবে মারা গেছে বহু লোক। আশার কথা হলো গত বছর বজ্রপাতে, সাপের কামড়ে এবং অগ্নিকান্ডে কেউ অপমৃত্যুর শিকার হননি।
ফরিদগঞ্জ অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন,‘গ্রামের মেয়েরা অনেক সময় আবেগ প্রবন হয়ে আত্মহত্যার পথ বেচে নেয়। নারীদেরকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে হলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমরা অপমৃত্যুর মামলা গুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করি।’
পত্রপত্রিকা খুললেই চোখে পড়ছে আত্মহত্যার খবর। প্রতিদিন সারা দেশে যে অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে তার একটি বড় অংশই আত্মহত্যাজনিত। অপমৃত্যুর এই মিছিল যেন ক্রমেই বেড়ে চলছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এসব আত্মহত্যার পেছনের কারণ হলো পারিবারিক কলহ, যৌতুক বা অন্য কারণে স্বামী বা স্বামীর পরিবারের নির্যাতন, পরকীয়া, কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ায় স্ত্রীকে ভৎর্সনা, ধর্ষণ, বখাটেদের অত্যাচার, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব। যারা আত্মহত্যা করছেন, তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছর।
আত্মহত্যার যে সব কারণ সমাজবিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করেছেন ফরিদগঞ্জ উপজেলা তা থেকে কিছুটা হলেও উন্নত করেছে। যেমন গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখানে যৌতুক, কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ায় স্ত্রীকে ভৎর্সনা, স্বামীর পরিবারের নির্যাতনের কারনে কোনো অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে বয়সের ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষনার বিপরীত চিত্র ফরিদগঞ্জে দেখা গেছে। এখানে গত বছর যে ক’জন আত্মহত্যা করেছে তাদের অধিকাংশের বয়স ৩০ এর উপরে।
সমাজের সাধারণ মানুষ ছাড়াও আত্মহত্যা প্রবণতায় উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে মাদক গ্রহণকারীরা। এর কারণ নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত মাদক গ্রহণে বিষণœতা, অতিমাত্রায় মাদক গ্রহণের কারণে সিদ্ধান্তহীনতা বা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারা, চিকিৎসার পরও মাদকমুক্ত থাকতে ব্যর্থ হওয়া। এসব কারণ ছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায়ই অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের (এআরসি) গবেষণায় জানা গেছে, অপমৃত্যু সংক্রান্ত অধিকাংশ মামলা তদন্তে পুলিশের দায়সারা ভাব লক্ষণীয়। মাঝেমধ্যে কিছু ঘটনার তদন্তে মৃত্যুর কারণ বেরিয়ে এলেও ধামাচাপা পড়ে যায় অনেক আত্মহত্যার রহস্য। প্ররোচনার অভিযোগে হাজতবাস করতে হয়েছে এমন নজির সংখ্যায় অতিনগণ্য। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পার পেয়ে যাচ্ছে প্ররোচনাকারী অপরাধীরা। এদিকে কোনো কোনো ঘটনায় খুন করে আত্মহত্যা কিংবা দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে ঘাতকচক্র চালিয়ে দিচ্ছে। এ ধরনের খুনের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে রহস্য উদ্ঘাটন করা যাচ্ছে না। মাঝে মধ্যে কিছু ঘটনার তদন্তে মৃত্যুর কারণ বেরিয়ে এলেও ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে অনেক রহস্যজনক মৃত্যু। তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা নেয় পুলিশ। ফলে ঘটনার কিছুদিন পরই অধিকাংশ ঘটনারই রহস্য ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।
সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক পরিবেশগত দুরবস্থা থেকেই মানুষ মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। আর দুরবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পথ না পেলেই আত্মহননের পথ বেছে নেয়। যারা আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে, তাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। কাউন্সেলিং এবং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে আত্মহত্যার পথ থেকে তাদের ফেরানো সম্ভব। তাই আত্মহত্যার প্রবণতারোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বছরের প্রথম দিনেই পাইকপাড়া ইউ.জি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জে.এস.সি পরিক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় সুমাইয়া আক্তার আত্মহত্যা করে। ২৫ জানুয়ারি পূর্ব বড়ালী গ্রামে গভীর রাতে হায়াতুন্নেছা (৫৫) নামক এক মহিলাকে শ^াসরোধ করে হত্যা করা হয়। ২৭ জানুয়ারী হুগলি গ্রামে সুফিয়া বেগম (৫৫) আত্মহত্যা করে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ফরিদগঞ্জের ১নং বালিথুবার দেইচর গ্রামে পুত্রবধূর পরক্রীয়া প্রেমিকার সাথে অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক দেখে পেলায় প্রেমিক কর্তৃক শ^াশুড়ী খুন হন। ৭ মার্চে ফরিদগঞ্জ পৌরসভার নোয়াগাঁও গ্রামের মোখলেছুর রহমানের (মুকু) একমাত্র ছেলে মনির হোসেনের স্ত্রী সীমা আক্তার (২২) এর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। গলায় ওলনা পেঁচানো অবস্থায় সকালে ভাটিরগাঁও গ্রামের সউদ বাড়ির ভাড়া বাসা থেকে থানা পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। ৯ মার্চে ফরিদগঞ্জের বড়ালী গ্রামে বিষপানে রাসেল হোসেন মামুন নামের যুবকের আত্মহত্যা। ১ এপ্রিলে ফরিদগঞ্জের শাশিয়ালীতে শামছুন্নাহার (৪৫) নামের ৪ সন্তানের জননী আত্মহত্যা করে। ৯ এপ্রিলে ফরিদগঞ্জের পশ্চিম দায়চারায় হাসিনা আক্তার (৪৫) নামে এক মহিলা গলায় ফাস দিয়ে আত্মহত্যা করে। ২১ মে ফরিদগঞ্জে ইকবাল হোসেন (২৬) নামের এক যুবকের বিষপানে আতœহনন। ২৮ মে ফরিদগঞ্জের চর দুঃখিয়ায় ভাইয়ের হাতে প্রাণ গেল বোনের। ৭ জুনে ফরিদগঞ্জের বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের মদনেরগাঁও গ্রামের সানজিদা আক্তার নীলা (১৯) নামের এক যুবতীর লাশ উদ্বার করেছে পুলিশ। ৯ জুনে উপজেলার পাইকপাড়া উত্তর ইউনিয়নের কাশারা গ্রামের আনোয়ার হোসেন (২০) নামের এক যুবক পিতার কাছে বিদেশ যাওয়ার জন্য টাকা চেয়ে না পেয়ে বিষপানে আত্মহত্যা করে। ২৪ জুলাই উপজেলার ধানুয়া গ্রামে বৃদ্ধ মা সালেহা বেগম (৮০) কে চোখ উপড়ে ফেলে আছড়িয়ে মেরে ফেলে পাষন্ড ছেলে আবুল কালাম বাহার (৪৫)। ১৯ সেপ্টেম্বরে ফরিদগঞ্জের চরগুদাড়া এলাকায় ময়না আক্তার (১৮) নামের এক যুবতীর আত্মহত্যা। ২২ সেপ্টেম্বরে ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসার ৯ম শ্রেণির ছাত্রী সুমি আক্তার (১৬) আত্মহত্যা করে। ৩ নভেম্বর ফরিদগঞ্জের কাউনিয়া গ্রামে নাজমা বেগম নামের এক গৃহবধূর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। ২৮ নভেম্বর ফরিদগঞ্জের চরদুঃখিয়ায় মো.ইব্রাহীম (৪৩) নামের এক ঝিল পাহারাদারের জুলন্ত লাশ উদ্ধার করে থানা পুলিশ। এগুলা হলো উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা।
আত্মহত্যার প্রবনতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। স্বামীর সাথে পারিবারিক কলহের জের ধরে অভিমানে অনেক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তারমধ্যে বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছা থাকেনা। সংসারে অভাব-অনটন, চাওয়া-পাওয়ার সংমিশ্রন না ঘটলে আত্মহত্যা করে থাকেন। কাঙ্খিত কোন কিছু না পেলেই তাদের মধ্যে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছা হয় এবং সেই ইচ্ছা থেকেই তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আত্মহত্যার মতো ঘটনার জন্য শুধু যিনি আত্মহত্যা করেন তিনিই দায়ী নন এর জন্য সংশি¬ষ্ট পরিবারগুলোও দায়ী বলে অভিমত দেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। আত্মহত্যার মত ঘটনাগুলোকে কমিয়ে আনতে হলে ব্যক্তির পাশাপাশি সমাজকেও অনেক ভুমিকা পালন করতে হবে বলে তারা আরো মনে করেন।থানা এবং পত্রিকার তথ্য ছাড়াও আরো অনেক নারী-পুরুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। যে ঘটনাগুলো পত্রিকার পাতায় আসেনা। যা অজানায় রয়ে যায়। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্ট ছাড়া এ থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলেও সচেতন মহল মনে করেন।

শেয়ার করুনঃ
content_copyCategorized under