প্রথম পাতা , শীর্ষ খবর , ব্রেকিং নিউজ , জাতীয়

চাঁদপুরে বিভিন্ন স্থানে লোকজনকে ধরে বেদম প্রহার ॥ পুলিশ সুপারের হুঁশিয়ারী

person access_time 6 days ago access_time Total : 70 Views

আবু হেনা মোস্তফা কামাল/মাসুদ রানা/শ্যামল চন্দ্র দাস/ মফিজুল ইসলাম বাবুল ঃ পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা লাগবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন গুজবে চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে গলা কাটা, বস্তাওয়ালা কিংবা ছেলেধরা ভেবে একের পর এক মানুষকে প্রহার করা হচ্ছে। এরা মৃত্যু থেকে ফিরে আসছে। এমনি ঘটনা ঘটেছে চাঁদপুর সদর, শাহরাস্তি, ফরিদগঞ্জ, মতলব দক্ষিণ ও কচুয়াতে। এসব ঘটনায় চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. জিহাদুল কবির পিপিএম বিপিএম হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, যারা এসব গুজব ছড়াচ্ছে এবং লোকজনকে ধরে প্রহার করছে তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি এ ধরনের অপকর্ম থেকে বিরত থাকার জন্য চাঁদপুরবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন। গত কয়েকদিনে চাঁদপুরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো হচ্ছে- ১১ জুলাই বৃহস্পতিবার চাঁদপুর সদরের ইসলামপুর গাছতলা এলাকায় মনু মিয়া (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে বেদম প্রহার করেছে স্থানীয় জনতা। মারধরের শিকার ব্যক্তি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানার বাসাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। তার পিতা দুলু মিয়া। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে মনু মিয়া মানসিক ভারসাম্যহীন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কাউসার জানায়, চাঁদপুর সদরের বালিয়া ইউনিয়নের ইচলী কলোনি এলাকায় একজন ব্যক্তি ভিক্ষা করার জন্যে প্রবেশ করে। পরে স্থানীয় কয়েকজন তাকে ছেলেধরা ভেবে মারধর করতে করতে চাঁদপুর-রায়পুর সড়ক সংলগ্ন কাদির গাজী মার্কেটের কাছে নিয়ে আসে। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। তিনি আরো জানান, লোকজন যেভাবে তাকে মারধর করার শুরু করেছিলো, আরেকটু দেরী হলে লোকটি মারা যাওয়ার আশংকা ছিলো। চাঁদপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক দিলিপ কুমার জানান, সকালে গাছতলা এলাকা থেকে ৯৯৯তে ফোন করে ছেলে ধরা আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানায়। পরে আমরা গিয়ে উত্তেজিত জনতার কাছ থেকে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসি। এদিকে চাঁদপুর জেলার একাধিক স্থানে এ ধরনের ঘটনায় চাঁদপুর পুলিশ মিডিয়া সেলে একটি বিবৃতি দিয়েছেন পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির। বিবৃতিতে তিনি বলেন, কতিপয় স্বার্থন্বেষী মহল পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে মর্মে বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়াচ্ছেন। এ ধারাবাহিকতায় চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী কিংবা ভবঘুরে নারী পুরুষদের আটক করে গণপিটুনি দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনা চাঁদপুর পুলিশ বিভাগের নজরে এসেছে। যারা এর পিছনে আছে তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। গুজব ছড়ানোর পেছনে যারা জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
শাহরাস্তি অফিস প্রধান মাসুদ রানা জানান, পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা লাগবে এমন গুজবে গলাকাটা বস্তাওয়ালা ভেবে এক পাগলিকে(৬৫) নাজেহাল করে স্থানীয় এলাকাবাসী পুলিশে দিয়েছে। বুধবার শাহরাস্তি পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাজিরকামতা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছেলে ধরা আটকে সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে দিনভর চলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যামে লংকাকান্ড। স্থানীয়রা জানায়, ওইদিন সকালে আটক স্থানে (বড় বাড়ি) সংলগ্ন রাস্তার মাথায় অজ্ঞাত পাগলিকে ঘুরাফেরা করতে দেখে স্থানীয় লোকজন। এমন সময় কে বা কারা ওই মহিলাকে পদ্মা সেতুর গলাকাটা গ্রুপের লোক বলে আখ্যা দিলে হুজুগে লোকজন তাকে মারধর করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর মোহাম্মদ মোল্লার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে নিয়ে যায়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ তাকে থানা হেফাজতে নেয়। পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর মোহাম্মদ মোল্লা জানান, এলাকাবাসি একজন মহিলাকে সন্দেহজনক ঘুরাফেরা করতে দেখে গলাকাটা ছেলে ধরা মনে করে মারধর করে আমার দোকানে নিয়ে আসে। আমি মানুষের রোষানল হতে তাকে বাঁচাতে পুলিশে খবর দেই। শাহরাস্তি থানার উপ-পরিদর্শক মোঃ জহিরুল ইসলাম জানান, থানা হেফাজতে নেয়া মহিলাটি মানসিক ভারসাম্যহীন। আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি তার বাড়ি নেত্রকোনা সদর থানা এলাকায়। পরিবারের লোকজন এলে তাদের জিম্মায় তাকে দেয়া হবে। শাহরাস্তি অফিসার ইনচাজ মোঃ শাহ আলম জানান, হেফাজতে থাকা মহিলাকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজবে হুজুগে কিছু লোকজন এসব করছে। গুজবে কান না দেয়ার জন্য তিনি এলাকাবাসীর কাছে আহবান জানান।
ফরিদগঞ্জ অফিস প্রধান আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, ফরিদগঞ্জে কয়েকশত জনতা দলবদ্ধ হয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গত দুইদিনে আশি বছরের এক নারী ও মধ্য বয়সের এক পুরুষকে বেদম পিটুনী দিয়েছে। তাদের দুই জনই মানসিক ভারসাম্যহীন। তাদের উদ্ধার করেছে ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশ। দুই জনেরই পরিচয় পাওয়া গেছে। ঘটনা দু’টি ঘটেছে উপজেলার ১৫নং ও ৫নং ইউনিয়নের নারিকেলতলা গ্রামে। নিছক একটি গুজব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ছেলে ধরার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবুও, স্কুলে ছাত্রসংখ্যা কমে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কোনো যাচাই না করেই আতংকে ভূগছেন অভিভাবক। গুজবে কান না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন পুলিশের ওসি আব্দুর রকিব। দুইজনকে পিটানোর ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। এদিকে, এমন পৈশাচিক ঘটনায় থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। ৫নং গুপ্টি ইউনিয়নের মিজান ভদ্র জানিয়েছেন, নারিকেলতলা গ্রামের নোয়া বাড়ির খোরশেদ আলমের ঘরের পাশ দিয়ে দুপুরে একজন নারী হেঁটে যাচ্ছিলেন। তাকে দেখে বাড়ির নূর আলমের মা চিৎকার দেন। এতে বাড়ির কয়েকজন লোক ছুটে গিয়ে ধমকিয়ে তাকে একথা সেকথা জিজ্ঞেস করেন। ছেলেধরা আটক হয়েছে বলে মূহুর্তে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। শত শত লোক সেখানে ছুটে যান। এক পর্যায়ে উৎসুক জনতা তাকে বেদম পেটানো শুরু করেন। এতে শিশু কিশোররাও অংশ নেন। পিটুনী খেয়ে ওই নারী বারবার মুর্চ্ছা যাচ্ছিলেন। তারপরও জনতার উগ্রতা থেকে রেহাই পাননি নারী। এক পর্যায়ে কিছু সংখ্যক লোক তাকে সংশ্লিষ্ট ইউপি কার্যালয়ে নিয়ে যান। চেয়ারম্যান বাবুল পাটওয়ারী থানা পুলিশের ওসিকে খবর দেন। এতে এ.এস.আই. মঞ্জুর আলমসহ এককদল পুলিশ ওই নারীকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান। জানা গেছে, গণপিটুনীর শিকার নারীর বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার পশ্চিম সকদী গ্রামে। তার নাম জুলেখা বেগম (৮১) স্বামীর নাম মুসলিম খাঁ। তিনি বিভিন্ন গ্রামে ও বাড়ি বাড়ি ঘুরে জীবন ধারণ করেন। পুলিশ জানিয়েছে বয়স হওয়ার কারণে তিনি গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না। এদিকে, উপজেলার ১৫ নং রূপসা ইউনিয়নের রায়পুর উপজেলামুখি নারিকেলতলা এলাকায় আঞ্চলিক মহাসড়কে অপর ঘটনাটি ঘটে বুধবার বিকালে। এলাকাবাসি জানান, সড়ক ধরে হাঁটছিলেন ওই ব্যক্তি। প্রথমে তার পিছু নেয় কয়েকজন কিশোর। এরপর কানাঘুষা হতে হতে তার আশেপাশে জড়ো হয় কয়েক শ’ জনতা। তাকে এ কথা সেকথা জিজ্ঞেস করে। এক পর্যায়ে ছেলেধরা সন্দেহে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে একদল জনতা। তারা তাকে বেদম মারধর করে। এতে তিনি নুয়ে পড়েন তিনি। তারপারও তারা দমেননি। সংবাদকর্মীর মাধ্যমে খবর পেয়ে ফরিদগঞ্জ থানার এস.আই. সুমন্ত ওই ব্যক্তিকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখানে তার প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। তার বিষয়ে রাঙ্গামাটির বরকল থানায় যোগাযোগ করা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত ব্যক্তিকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে ধারনা করা হচ্ছে। তার সঙ্গে কথা বললে তিনি দাবী করেছেন, রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার কলাবানিয়া গ্রামে তার বাড়ি। তার নাম জাহাঙ্গীর আলম (৩৪)। পিতার নাম আব্দুল গণি। এদিকে, বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ এসব ঘটনাকে উচ্ছৃংখলতা বলে মন্তব্য করেছেন। এমন অমানুষিকভাবে না পিটিয়ে ও ফেসবুকে গুজব না ছড়িয়ে সন্দেহ হলে পুলিশে দেয়া যেতো বলেও তারা মন্তব্য করেন। উপজেলার সোনালী বালিকা উচ্চ বিদ্যলয়ের প্রধান শিক্ষক এস.এম. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ছেলেধরা আতংকে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। এ ব্যাপারে ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইন-চার্জ আব্দুর রকিব জানান, এসব নিতান্তই গুজব। গত কয়েকদিনে এমনি করে আমাদের থানা থেকে কারও সন্তান হারিয়ে যাওয়ার একটি জিডিও হয়নি। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, নিরীহ মানুষের ওপর কেনো এই পাশবিকতা। তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, কারও প্রতি কোনো সন্দেহ হলে থানা পুলিশকে খবর দিন, আইন হাতে তুলে নেবেন না। এক পশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এমন পৈশাচিক ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। উল্লেখ্য, ভিডিও ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
মতলব দক্ষিণ অফিস প্রধান শ্যামল চন্দ্র দাস জানান, মতলব দক্ষিণ উপজেলার নায়েরগাঁও দক্ষিণ ইউনিয়নের খিদিরপুর গ্রামে ছেলেধরা সন্দেহে (গলাকাটা চোর) আমির হোসেনকে স্থানীয় জনতা কর্তৃক আটক করেছে। এ ঘটনাটি ঘটেছে গত ১১ জুলাই বেলা পৌনে ১২টার সময় বকাউল বাড়ীতে। আটক আমির হোসেনের পিতার নাম মোঃ মজিবুর রহমান, গ্রামের বাড়ী মতলব পৌরসভার নবকলস। স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ সূত্রে জানায়, খিদিরপুর গ্রামের হানিফ বকাউলের কন্যা ৪র্থ শ্রেনীর ছাত্রী হাসনা আক্তারকে মধু খাওয়ানোর নাম করে পাশের বাগানের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় ভয়ে হাসনা ডাক চিৎকার দিয়ে দৌড়িয়ে মায়ের কাছে চলে যায়। ঘটনাটি মাকে অবহিত করলে মা আশেপাশের লোকজনকে জানালে সবাই দৌড়ে গিয়ে খিদিরপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে আমির হোসেনকে পেয়ে আটক করে। স্থানীয় জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে আমিরকে বেদম প্রহার করে। ঘটনাটি মতলব দক্ষিণ থানাকে অবহিত করলে মতলব দক্ষিণ থানার অফিসার ইনচার্জ একেএমএস ইকবাল সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন এবং আমির হোসেনকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন। মতলব দক্ষিণ থানার অফিসার ইনচার্জ একেএমএস ইকবাল বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমির হোসেনকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসি। আটক আমির হোসেন মধুর বাসা থেকে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে । সে মধুর চাক কাটতো। বেশ কয়েকজন যুবক মধু ছিনিয়ে নিতে গিয়ে এ ঘটনাটি ঘটায়। উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন যাবৎ গলাকাটা ও ছেলেধরার গুজব উঠেছে। সাধারণ মানুষের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। আর এই গুজবকে কেন্দ্র করেই এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে।
কচুয়া উপজেলা প্রতিনিধি মফিজুল ইসলাম বাবুল জানান, কচুয়া উপজেলার গোহট উত্তর ইউনিয়নের পালগিরী গ্রামের কাচারি বাড়িতে এক অপরিচিত পাগলকে দেখে মানব পাচারকারী সন্দেহে স্থানিয় লোকজন মারধর করে। ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত লোকজন তাকে এক নজর দেখার জন্য বিড় জমায়। ঘটনাটি ঘটে ১০ জুলাই বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে। পরে এলাকার লোকজন তাকে কচুয়া থানায় সপর্দ করে। কচুয়া থানা অফিসার ইনচার্জ মোঃ ওয়ালী উল্লাহ ঘটনাটি নিশ্চিত করেন।

content_copyCategorized under