পাঠক বন্ধন

এসডিজি অর্জনে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ: মানসম্মত শিক্ষক তৈরীতে করণীয়

person access_time 8 months ago access_time Total : 310 Views

——————–মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ (মারুফ)————————-
গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা অনেকদূর এগিয়েছে। ফলশ্রুতিতে জাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা (এমডিজি-২) এবং জেন্ডার সমতা অর্জন ও নারীর ক্ষমতায়ন (এমডিজি-৩) এই দুটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যের কারণে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে ’রোল মডেল’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের মাপকাঠিতে ২০১৬ সালে প্রাথমিক স্কুলে প্রকৃত ভর্তির হার ৯৭.৯৪ শতাংশ(তথ্যসূত্র:ওয়েবসাইট, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়)। এর মধ্যে ছেলে ৯৬.৬ এবং মেয়ে ৯৮.৮ শতাংশ। জেন্ডার সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রাথমিক শিক্ষায় ১০০ জন ছেলের বিপরীতে ১০৩ জন মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষকরে প্রাথমিক শিক্ষায় এমডিজি অর্জনের এই সাফল্য আমাদের নির্ধারিত সময়ে টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা (এসডিজি) এর লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ আত্মবিশ্বাসী করে তুলে। বিশ্বের আরো ১৯৩ টি দেশের সাথে বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষিত ২০১৬-২০৩০ মেয়াদে ১৭ টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা (এসডিজি) বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এসডিজি’র অন্যতম প্রধান লক্ষ্যমাত্রা হল অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সকলের জন্য শেখার সুযোগ নিশ্চিতকরণ ( এসডিজি-৪)। এসডিজি-৪ লক্ষ্যমাত্রার সাতটি টার্গেট নির্ধারন করা হয়েছে যার মধ্যে জেন্ডার সমতাকে আবারো বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং সমতাভিত্তিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে।
মানসম্মত শিক্ষাকে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এসকল সংজ্ঞা হতে বলা যায়- মানসম্মত শিক্ষা হচ্ছে মূলত একগুচ্ছ বিষয় যার মধ্যে পরীক্ষার গ্রেড একটি অংশমাত্র। পরীক্ষার ভাল গ্রেডের পাশাপাশি যে শিক্ষা শিক্ষার্থীর শারিরিক, মানসিক, আত্মীক উন্নয়নসহ চিন্তন দক্ষতা ও বিশ্লেষন ক্ষমতা বাড়াবে তাই মানসম্মত শিক্ষা। তাই মানসম্মত শিক্ষার কর্মসূচী বাস্তবায়ন অর্জন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এসডিজি’র এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন দূরদর্শী নীতি এবং উদ্ভাবনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রথমেই প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক। এসডিজি-৪ এর ৪(গ) তে বলা আছে- ‘ইু ২০৩০, ংঁনংঃধহঃরধষষু রহপৎবধংব ঃযব ংঁঢ়ঢ়ষু ড়ভ য়ঁধষরভরবফ ঃবধপযবৎং, রহপষঁফরহম ঃযৎড়ঁময রহঃবৎহধঃরড়হধষ পড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ ভড়ৎ ঃবধপযবৎ ঃৎধরহরহম রহ ফবাবষড়ঢ়রহম পড়ঁহঃৎরবং, বংঢ়বপরধষষু ষবধংঃ ফবাবষড়ঢ়বফ পড়ঁহঃৎরবং ধহফ ংসধষষ রংষধহফ ফবাবষড়ঢ়রহম ঝঃধঃবং’
পেশাগতভাবে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক পেতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘসময় শিক্ষা নিয়ে সরেজমিন কাজ করতে গিয়ে পেশাগতভাবে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকপুল তৈরীতে যে সকল সমস্যা আমাদের পর্যবেক্ষনে এসেছে তা সমাধানের সুপারিশসহ তুলে ধরা হল:
প্রথমেই শিক্ষকতা পেশায় যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে নীতিগত উপায় উদ্ভাবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার সকল সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন দ্বিগুনেরও বেশী বৃদ্ধি করেছে যা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। এখন যা করা যেতে পারে তা হল মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের বিভিন্ন পদের বেতন স্কেল উচ্চধাপে উন্নীতকরণের দাবী সহানুভূতিসহকারে বিবেচনা করা। সেই সাথে শিক্ষকতা পেশায় বিশেষ প্রণোদনাও দেয়া যেতে পারে। যেমন, শিক্ষকতা বা প্রশিক্ষণকালিন যেসকল শিক্ষক নির্ধারিত সাফল্য দেখাতে পারবেন তাদের বিদেশ প্রশিক্ষনসহ অন্যান্য প্রেষনাদান, ডাবল শিফট বা অতিরিক্ত খাটুনীর জন্য ভাতা প্রদান ইত্যাদি।
দ্বিতীয়ত: শিক্ষক নিয়োগে বিদ্যমান শিক্ষাগত যোগ্যতা পূনর্মূল্যায়ন করা বিশেষ প্রয়োজন। সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কমপক্ষে ¯œাতক পাশ এবং প্রধানশিক্ষক পদে কমপক্ষে মাস্টার্স পাশ হওয়া জরুরী। একটা সময় আমাদের দেশে শিক্ষার হার কম থাকাতে এবং নারীর ক্ষমতায়নের নিশ্চিত করতে পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে যথাক্রমে এইচএসসি ও এসএসসি পাশ প্রার্থীকেও প্রাথমিক স্কুলে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকাতে এই সমস্ত সম্মানিত শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন কাম্য পর্যায়ে নেয়া সম্ভব হয়না। পেশাগত মানোয়ন্নয়নের জন্য শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচীর কোন বিকল্প নেই। দেখা যায়, বিভিন্ন প্রশিক্ষন কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করার পরও তারা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনা।
তৃতীয়ত: বাংলাদেশের সকল পর্যায়ে রয়েছে শিক্ষকের অপ্রতুলতা। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে অনুপাত তা মান সম্মত শিক্ষার জন্য মোটেও অনুকূল নয়। প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৫০ এরও বেশী। বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ে এই অনুপাত আরো ভয়াবহ। এখানে রয়েছে তীব্র শিক্ষক সংকট। গ্রাম পর্যায়ে এমনও স্কুল পাওয়া যায় যেখানে ২০০-২৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ২-৩ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। এই সমস্যা সমাধানে জরুরী ভিত্তিতে যে সকল স্থানে শিক্ষক সংকট রয়েছে সেখানে নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ডাবল শিফট স্কুল চালু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত স্বল্পমেয়াদে ১:৪০ এবং র্দীর্ঘমেয়াদে এই অনুপাত ১:২৫ এ নিয়ে আসা।
চতুর্থত: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরেপক্ষ হওয়া বিশেষ প্রয়োজন।এতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হবে। বিদ্যমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জেলা পর্যায়ে নিয়োগ পরীক্ষা হয়। যাতে এক শ্রেণীর অসৎ লোক প্রশ্ন ফাঁস, কেন্দ্রে নকল সরবরাহ বা প্রভাব বিস্তার এবং মৌখিক পরীক্ষায় অন্যায্য তদবিরসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। বর্তমানে মোবাইল ফোন ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করেও প্রশ্নফাঁস ও নকল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে অনেক কমযোগ্য প্রার্থী চাকুরী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকুরী পেয়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদে পরীক্ষার হলে মোবাইল জ্যামার ব্যবহার, ৮-১০ সেট প্রশ্ন ব্যবহার, পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন প্রণয়ন, প্রশ্ন তৈরী হতে পরীক্ষাগ্রহন পর্যন্ত সকল প্রক্রিয়া সিসি ক্যামেরা দ্বারা নজরদারী ইত্যাদি পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে, প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ পিএসসি’র অধীনে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিদ্যামান শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য বিসিএস এর পরিবর্তে ইধহমষধফবংয ঊফঁপধঃরড়হ ঝবৎারপব (ইঊঝ) নাম দিয়ে আলাদা পরীক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে। সরকারী কলেজে ক্যাডার পদে নিয়োগের পর লিখিত পরীক্ষায় যারা পাশ করবে তাদের নন-ক্যাডার হিসেবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগের সুপারিশ করা যেতে পারে।
পঞ্চমত: শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরা। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সকল পর্যায়ের শিক্ষকগণ যাতে নিয়মিত প্রশিক্ষন পান তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে সরকার উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে অনেকগুলো প্রশিক্ষন কোর্স পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারী দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ তাদের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রয়োগের উদ্যেগ খুব কম চোখে পড়ে। অন্যান্য সেক্টরের সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মত শিক্ষকগণও পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধি বা প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান অর্জন বা প্রয়োগ কোনটাতেই প্রয়োজনীয় আগ্রহ দেখান না। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরনে শিক্ষকগণ যেন তাদের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ক্লাশে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রয়োগ করেন, এজন্য প্রয়োজনীয় প্রেষণা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষনলব্ধ জ্ঞান কøাশরুমে প্রয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। এজন্য বর্তমান শিক্ষা অফিসার এবং অন্যান্য কর্মকতাদের তদারকি প্রক্রিয়ায়ও উদ্ভাবনী ধারনা ও পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেমন, শাহরাস্তি উপজেলায় কল সেন্টারের মাধ্যমে অফিসে বসেই কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন স্কুলে শ্রেণীকার্যক্রম মনিটরিং করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে উপজেলা কল সেন্টারে সকল স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকের ডাটাবেজ তৈরী করা আছে। একজন তদারককারী কর্মকর্তা কল সেন্টারে বসে সরাসরি ক্লাশরুমের শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ এবং শ্রেণীর পাঠদান কার্যক্রম তদারকি করতে পারেন। প্রয়োজনে তিনি কল কন্ফারেন্সের মাধ্যম ক্লাশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে একসাথে কথা বলতে পারেন। এতে করে যে কোন সময় যে কোন স্কুলে তদারকি করা সম্ভব। ফলশ্রুতিতে স্কুলের সংশ্লিষ্ঠ সকলের মধ্যে সতর্কতা ও সচেতনতা তৈরী করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় পাশের হার সন্তোষজনক হলেও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মৌলিক সাক্ষরতা, গণিত ও ভাষা জ্ঞানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে পারছেনা। এই ব্যর্থতার পিছনে অন্যান্য অনেকগুলো কারণ সক্রিয় থাকলেও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভার, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষন, প্রেষনা প্রদানসহ দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকপুল তৈরীতে ব্যর্থতার ফলে মানসম্মত শিক্ষার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছেনা । এরূপ মানহীন শিক্ষা দীর্ঘায়িত হলে এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের পিছিয়ে পড়তে হবে। এসডিজি অর্জনে ইতিমধ্যে প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আমরা যদি এখনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে না পারি তাহলে শিক্ষার আদর্শিক গুনগত মানে পৌছানো সম্ভব হবেনা।
লেখক: উপজেলা নির্বাহী অফিসার, শাহরাস্তি , চাঁদপুর।

শেয়ার করুনঃ
content_copyCategorized under